মতামত

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। ছবি : সংগৃহীত
সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব : শাহদীন মালিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এর ৫ দিন পর মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন নবনির্বাচিত সদস্যরা। গঠিত হয়েছে নতুন সরকার ও নতুন সংসদ। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও নেননি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এমপিরা। আর সে কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেল। এ নিয়ে একটি গণমাধ্যমে বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। উত্তর দিয়েছেন বেশ কিছু প্রশ্নের। প্রশ্ন : সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা।এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। এ অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কী হবে? শাহদীন মালিক : এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি, নতুন অভিজ্ঞতা। দুই পক্ষের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এই পরিষদকে শপথ পড়াবেন কে? পরিষদে সভাপতিত্ব করবেন কে? জাতীয় সংসদের স্পিকারই কি এখানে সভাপতিত্ব করবেন? নাকি এখানকার জন্য আলাদা স্পিকার নির্বাচিত হবেন? এই বিষয়গুলোর সমাধান হয়নি।তাই দুই পক্ষের অবস্থান দুই রকম। প্রশ্ন : এর সমাধান কী? শাহদীন মালিক : সমাধান খুঁজতে হলে দেখতে হবে, সাধারণ মানুষ কী চায়। সাধারণ মানুষ কিন্তু জেদাজেদি চায় না। তারা চায় স্থিতিশীলতা। গত দেড় বছরের অস্থিরতার পর মানুষ এখন চায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক হবে ইত্যাদি।তাই সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। সাংবিধানিক কোনো ব্যাপার থাকলে বা আইনে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে এখন তো সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদ আছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, যা কিছু হওয়া উচিত সংসদ থেকেই। প্রশ্ন : নতুন সরকার কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : পত্রিকায় দেখলাম ৭০ শতাংশ এমপিই নতুন, মানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। এখান থেকেই তো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী হয়ে সরকারে গেছেন ওনারা। তার মানে এমপিদের মতো নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও অনেকে নতুন। তাই নতুন মন্ত্রিপরিষদ স্বাভাবিক হতে একটু তো সময় লাগবেই। প্রশ্ন : নতুন সংসদ কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : একই উত্তর প্রায়। তবে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওনারা। খবরে দেখলাম বিরোধী দল ও সরকারি দল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না সংসদ সদস্যরা। তার মানে সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। সূত্র : খবরের কাগজ

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন

মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত গাইডলাইন পবিত্র কোরআন। হেরা পর্বতে আল্লাহর ধ্যানে থাকা অবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) হাজির হন রসুল (সা.)-এর কাছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি রসুল (সা.)-কে কোরআনের যে আয়াতটি প্রথমে পৌঁছে দেন সেটি হলো ‘পড়, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক সম্মানিত, যিনি কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তারা জানত না।’ সুরা আলাক-১-৫। কোরআনের এ আয়াতটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যারা আল্লাহকে সব ক্ষমতার মালিক এবং জগৎ-মহাজগতের সবকিছুর স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করেন, যারা মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর রসুল বলে স্বীকার করেন, যারা জিবরাইল (আ.)-কে ফেরেশতা হিসেবে বিশ্বাস করেন তাদের জন্য ওই আয়াতটি দিকনির্দেশনামূলক। পবিত্র কোরআনের সূচনা ‘পড়’ এই হুকুমসংবলিত শব্দের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য জ্ঞান অর্জনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তা এ আয়াতটিতে স্পষ্ট। অথচ রসুল (সা.) নিজেই ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন। তিনি অক্ষরজ্ঞানের অধিকারী না হলেও আল্লাহর ইচ্ছা এবং জাগতিক ও পারলৌকিক জ্ঞানের ভান্ডার কোরআনের বদৌলতে উম্মতদের আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাসের কারণেই মোমিনদের অবশ্য কর্তব্য হলো- জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হওয়া। কারণ আমাদের যিনি স্রষ্টা তিনি মানবজাতির চলার পথের গাইডলাইন হিসেবে যে পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন তাতে প্রথমেই পড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ পড়া অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনোরকম হেলাফেলার অবকাশ নেই। আমাদের উচিত হবে নিজেদের যেমন জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়া, তেমন আমাদের শিশুসন্তানকেও সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। সে যাতে কোরআন-হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে তা নিশ্চিত করা। বড় হয়ে কর্মজীবনের উপযোগী শিক্ষাও সন্তানের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সন্তান বড় হওয়ার পর জীবিকার জন্য কারও মুখাপেক্ষী না হয়। রসুল (সা.) অপরের কাছে হাত পাতাকে অপছন্দ করতেন। তিনি তাঁর উম্মতদের স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সেই জাতি তত উন্নত। শিক্ষা ব্যতিরেকে কোনো জাতির উন্নতি কল্পনা করা যায় না। জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সফলতা অর্জনে শিক্ষার বিকল্প নেই। এজন্য নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক ঐশী শিক্ষার সমন্বিত শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে মানুষকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথ দেখায়। মানবতার মুক্তির মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দটি যেহেতু ‘পড়’ সেহেতু মানুষের কল্যাণ সাধনে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে রসুল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার কথা বর্ণনা করে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই ওই সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মাঝে স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন যিনি তাদের তাঁর (আল্লাহর) আয়াত পাঠ করে শোনান, তাদের আত্মিক পরিশুদ্ধ এবং তাদের কিতাব (আল্লাহর বাণী) ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা স্পষ্ট অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।’ সুরা জুমু’আ-২। ইসলাম জ্ঞানবিজ্ঞানে পান্ডিত্য অর্জন করা ও শিক্ষাদীক্ষায় দক্ষ ও সুশিক্ষা লাভ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। এজন্য ইসলামের প্রথম যুগের মনীষীগণ শিশুদের একত্র করে শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন। হজরত হিশাম ইবনি উরওয়াহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর সন্তানদের একত্র করে বলেন, হে আমার সন্তানেরা! তোমরা ইলম শিক্ষা কর। যদিও তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু। আশা করা যায় অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে।   আর কোনো বয়োবৃদ্ধের জন্য এর চেয়ে খারাপ কোনো অবস্থা নেই যে, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে তার কাছে কোনো ইলম (তথ্য) পাওয়া যাবে না। -সুনানে দারিমি। এ ব্যাপারে রসুল (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.)-এর একটি উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনাও বর্ণিত আছে হজরত শুরাহবিল বিন সাঈদ (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হজরত হাসান (রা.) তাঁর ছেলে এবং ভাতিজাকে ডেকে বললেন, হে আমার বৎস এবং ভাতিজা, তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু-অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে। অতএব তোমরা ইলম শিক্ষা কর। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি তা বর্ণনা করতে অথবা মুখস্থ করে সংরক্ষণ করতে সক্ষম না হয় সে যেন তা লিখে রাখে এবং তা নিজ ঘরে রেখে দেয় (সংরক্ষণ করে)।-সুনানে দারিমি। উল্লিখিত দুটি ঘটনা শিশুদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের দলিল ও প্রমাণের নির্দেশনা।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
রোজা রেখে ইনজেকশন-ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি?

রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করা গুরুতর গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন   يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৩)   তবে রোজা অবস্থায় অনেক সময় রোগীর ওষুধ গ্রহণ, ইনজেকশন নেওয়া বা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দেয়—এসব চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোজা নষ্ট হবে কি না। সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকিহরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিচে ইনজেকশন, ইনসুলিন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধান উপস্থাপন করা হলো।   রোজা রেখে ইনজেকশন ও ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি? আধুনিক মাসায়েলার আলোকে বিশ্লেষণ   ইনজেকশন নেওয়ার বিধান রোজা অবস্থায় শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি ছাড়া অন্য যেকোনো চিকিৎসাগত কারণে ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না—চাই তা মাংসে (ইন্ট্রামাসকুলার) দেওয়া হোক বা রগে/শিরায় (ইন্ট্রাভেনাস)।   কারণ ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে একটি অস্বাভাবিক পথ দিয়ে (অর্থাৎ মুখ, নাক বা স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ নয়)। ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গ হওয়ার জন্য খাদ্য বা পানীয় জাতীয় কিছু স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানো শর্ত। ইনজেকশনের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। (আল্লামা ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯৫; ইবনু নুজাইম, আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড ২, পৃ. ২৭৮; আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল, খণ্ড ৩, পৃ. ২১৪)   ইনসুলিন গ্রহণের বিধান ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিন নেওয়া একটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। শরিয়তের দৃষ্টিতে ইনসুলিন নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ, ইনসুলিনও ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং তা খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য হয় না। এটি স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে না এবং পাকস্থলীতে পৌঁছায় না। ফলে রোজা নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ সৃষ্টি হয় না। (ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৭; ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, পৃ. ৩২৭)   ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও রক্ত নেওয়া ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করেন। এ ক্ষেত্রে আঙুলে সূচ ফুটিয়ে একফোঁটা রক্ত নেওয়া হয়। ফকিহদের মতে, এতটুকু রক্ত নেওয়ার ফলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ, এতে শরীরে কোনো খাদ্য বা পানীয় প্রবেশ করে না; বরং অল্প পরিমাণ রক্ত বের হয়, যা রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।   রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে শরিয়ত বাধা দেয় না। ইনজেকশন (শক্তিবর্ধক না হলে), ইনসুলিন গ্রহণ এবং সুগার পরীক্ষা—এসবের মাধ্যমে রোজা নষ্ট হয় না বলে প্রখ্যাত ফকিহ ও সমসাময়িক আলেমরা মত দিয়েছেন।   অতএব, যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীরা, তারা অযথা দুশ্চিন্তা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। তবে জটিল বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজ নিজ বিশ্বস্ত আলেম ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।   আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে সুশাসন

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেশের মানুষ সুশাসনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছে। ইসলাম সুশাসনের তাগিদ দেয়। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) ছিলেন বিশ্বের সেরা জ্ঞানীদের একজন। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর  জামাতা। পুরুষদের মধ্যে আলী (রা.) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের এই চতুর্থ খলিফা শাসক হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার যে নজির রেখেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। হজরত আলী (রা.)-এর খুতবাহ, বক্তৃতা, চিঠিপত্রের সংকলন ‘নাহজুল বালাগাহ’। এতে মিসরের গভর্নর হজরত মালিক আশতারকে লেখা খলিফা আলী (রা.)-এর চিঠিতে শাসন ক্ষেত্রে ন্যায় ও সুবিচার নিশ্চিত করার যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা সর্বযুগে অনুকরণীয়।   হজরত আলী (রা.) মালিক আশতারকে লেখা চিঠিতে বলেন, অন্তরে ভাবাবেগ জাগ্রত হলে, কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ না হলে মানুষের অন্তঃকরণ তাকে পাপের দিকে নিয়ে যায়।...অতএব তুমি তোমার ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ কর এবং যা তোমার জন্য বৈধ নয়, সে কাজ থেকে তোমার অন্তরকে বিরত রাখ। নাহজুল বালাগার বক্তব্যে আমরা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থিব সমস্যাবলির বাস্তব সমাধান লাভ করি। তেমনি এতে সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্য ও নিরাপত্তা অর্জনের পথ খুঁজে পাই। যে লক্ষ্যে হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে লোকদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সুবিচার অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর চিঠিতে বলেন, ‘তোমার অন্তরকে তোমার অধীন জনগণের প্রতি ক্ষমা এবং তাদের প্রতি স্নেহ ও দয়া প্রদর্শনে অভ্যস্ত করে তোল। তুমি তাদের ওপর হিংস্র পশুদের ন্যায় চড়াও হইও না। তারা ভুল কাজ করতে পারে, তা ইচ্ছা করেই হোক বা উদাসীনতার কারণেই হোক। অতএব তুমি ঠিক সেভাবেই তাদের দিকে ক্ষমার হাত প্রসারিত করে দাও, যেভাবে তুমি পছন্দ কর যে আল্লাহ তোমার প্রতি ক্ষমা বিস্তার করে দিন। কারণ তুমি তাদের ওপরে স্থান লাভ করেছ এবং তোমার অধিনায়ক (আলী) তোমার ওপরে। আর যে তোমাকে নিয়োগ করেছে তার ওপরে আছেন আল্লাহ। তিনি (আল্লাহ) চেয়েছেন যে তুমি তাদের বিষয়াদি পরিচালনা করবে এবং তিনি তাদের মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করছেন।   হজরত আলী (রা.) সমাজে সুবিচারের বাস্তব রূপায়ণে বলেন : ‘ক্ষমা করার কারণে অনুতপ্ত হইও না এবং শাস্তি দিতে পেরে গর্বিত হইও না। ক্রোধের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিও না। এ কথা বলো না যে ‘আমাকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব আমি যখন আদেশ দেব তখন অবশ্যই তা পালিত হতে হবে।’ কারণ তা অন্তরে বিভ্রান্তি ও দীনে দুর্বলতা সৃষ্টি করে এবং তা ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন : ‘তোমার জন্য সর্বাধিক বাঞ্ছনীয় হওয়া উচিত তাই যা সর্বাধিক ন্যায়ানুগ, যা সর্বাধিক মাত্রায় সর্বজনীন সুবিচারপূর্ণ এবং তোমার অধীনদের পছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বাধিক বোধগম্য। হজরত আলী (রা.)-এর ওই বক্তব্যে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সুবিচার বিস্তারের মর্মবাণী ও মানবিক আবেদন নিহিত রয়েছে, তা অনুধাবন করা যে কারও পক্ষেই সম্ভব। সম্ভবত সব পার্থিব শাসনব্যবস্থা পক্ষপাতিত্বের দোষে আক্রান্ত। আলী (রা.) এ ধরনের শাসনব্যবস্থার শাসকদের জালেম এবং এ কারণে নৈতিকতার মূল্যবোধ পদদলিতকারী ও মানবিকতার উদ্দেশ্য নস্যাৎকারী শোষক হিসেবে অভিহিত করেন। অবৈধ ও বেআইনি কার্যকলাপ এবং গোষ্ঠী বিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে যেভাবে জুলুম করা হয় তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুবিচার বিস্তারের ধারণা হারিয়ে যায়। কেবল সেসব লোকই এ ধরনের জুলুমমূলক পদ্ধতি পরিহার করে চলেন, যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তারা সমাজকে সেই দিকে পরিচালিত করেন। হজরত আলী (রা.) যেজন্য মালিক আশতারকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন সমাজকে সবার, বিশেষ করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের কল্যাণসাধনের লক্ষ্যাভিসারী করে গড়ে তোলেন। হজরত আলী (রা.) বলেন : যারা মুসলমানদের ধর্মীয় শক্তির স্তম্ভ এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাস্বরূপ, তারা হচ্ছে সাধারণ জনগণ। অতএব তোমার উচিত তাদের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। হজরত আলী (রা.) এখানে গভর্নর মালিক আশতারকে যে পথনির্দেশ দিয়েছেন, এটাই হলো আজকের দিনে প্রকৃত গণমুখী শাসনব্যবস্থা। অত্যন্ত চমৎকারভাবে ইসলামের চতুর্থ খলিফা জনগণের স্বার্থরক্ষার্থে চেষ্টা-সাধনা চালানো ও তাদের দিকে মনোযোগী থাকার ওপরে গুরুত্বারোপ করেছেন। শাসক বা প্রশাসকদের পরামর্শদাতা বা উপদেষ্টাদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি তুলে ধরেছেন। যা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ তিনি সাধারণ জনগণকে ধর্মের স্তম্ভ, রাষ্ট্রের শক্তি ও শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রাচীর বলে গণ্য করেছেন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬ 0
প্রতীকী ছবি
ইসলামে রাজনীতি : ইবাদত, জবাবদিহি ও মানবকল্যাণ

রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ইসলাম—রাজনীতিকে ধর্মের বাইরে কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নয়, বরং এটিকে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত। এই আয়াতে ক্ষমতা লাভের পর ইসলামী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১) আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ১. নামাজ কায়েম করা : ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে নামাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে এর মধ্যে নামাজ দ্বিতীয়। নামাজ ছাড়া ইসলামের মৌলিকত্ব অসম্ভব। ঈমানের পর ইসলামে নামাজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব অন্য কোনো ইবাদত প্রদান করা হয়নি। ইসলামী রাজনীতির প্রথম অঙ্গীকার হলো নামাজ কায়েম করা। সব মানুষ আসলে নামাজি হয়ে গেলে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলাই থাকবে না। কারণ নামাজ মানুষকে অবশ্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫) কাজেই নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির প্রতীক। যে রাষ্ট্র নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে। ২. জাকাত আদায় : জাকাত ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনীতির ইশতেহারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক। জাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার। জাকাত দানকারীদের নিজ দায়িত্বে জাকাতের সম্পদ জাকাত গ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের (ধনীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯) ৩. সৎ কাজের আদেশ : ‘সৎ কাজের আদেশ’ ইসলামী রাজনীতির গঠনমূলক দিক। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু নিষেধের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চায়। সৎ কাজের প্রসার মানে হলো—নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। এটি ইসলামী রাজনীতিকে ইতিবাচক ও জনমুখী করে তোলে। ৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ : ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এর অর্থ হলো— দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রয়োগ হবে পক্ষপাতহীন। এ দিকটি ইসলামী রাজনীতিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত :  ১০৪) ৫. আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা : আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’—এটি ইসলামী রাজনীতির নৈতিক উপসংহার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে। পরিশেষে বলা যায়, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হবে এমন একটি নীতিপত্র, যা নৈতিকতায় পরিশুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, সামাজিকভাবে কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীতিতে পরিচালিত। এই ইশতেহারে ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি। লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
গত রমজানের কাজা রোজা কি এখন রাখা যাবে

শারীরিক অসুস্থতা, সফর কিংবা নারীদের ঋতুস্রাবের মতো অপারগতার কারণে অনেক সময় রমজানের রোজা কাজা হয়ে যায়। মহান আল্লাহ দয়া করে এই রোজাগুলো পরবর্তী সময়ে আদায়ের সুযোগ দিয়েছেন।   বিশেষ করে রমজানের পূর্ববর্তী মাস শাবানে এসে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এত দেরিতে বা শাবান মাসে কাজা রোজা আদায় করা যাবে কি না।   কাজা রোজা আদায়ের সময়সীমা যেকোনো কারণে রমজানের রোজা ছুটে গেলে পরবর্তী রমজান আসার আগ পর্যন্ত বছরের যেকোনো সময় তা আদায় করা যায়। তাতে প্রায় ১১ মাস সময় থাকে। শওয়াল মাস থেকে শুরু করে শাবান মাস পর্যন্ত এই সুযোগ অবারিত।   আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তাকে অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪)   শাবান মাসে কাজা আদায়: শেষ সুযোগ শাবান মাস হলো রমজানের ঠিক আগের মাস। যদি কেউ সারা বছর ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে বিগত বছরের রোজা আদায় করতে না পারেন, তবে শাবান মাসই হলো তাঁর জন্য শেষ সুযোগ। শাবান মাসে কাজা রোজা রাখাতে শরয়ি কোনো বাধা নেই।   আয়েশা (রা.) থেকে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমার ওপর রমজানের কাজা রোজা বাকি থাকত, যা আমি শাবান মাস ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৪৬)   হাদিস বিশারদগণের মতে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর খেদমতে ব্যস্ত থাকার কারণে আয়েশা (রা.) সারা বছর রোজা রাখতে পারতেন না, তাই তিনি শাবান মাসে সেই কাজাগুলো পূর্ণ করতেন। সুতরাং যাদের রোজা বাকি আছে তাদের জন্য এটি একটি অপরিহার্য সুযোগ।   দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও পরবর্তী রমজান যদি কোনো ব্যক্তি গত রমজানে অসুস্থ থাকার কারণে রোজা রাখতে না পারেন এবং সেই অসুস্থতা পরবর্তী রমজান আসা পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে তবে তাকে বর্তমান রমজানের রোজা রাখতে হবে।   গত বছরের কাজা রোজাগুলো তাঁর জিম্মায় ‘বকেয়া ঋণ’ হিসেবে থেকে যাবে। সুস্থ হওয়ার পর তিনি সেগুলো আদায় করবেন। এক্ষেত্রে কোনো গুনাহ হবে না, কারণ আল্লাহ মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)   শাবান মাস শুরু হওয়ার পর প্রত্যেকের উচিত নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের বিগত রমজানের কোনো রোজা বাকি আছে কি না তা যাচাই করা।   যদি বাকি থাকে, তবে আর দেরি না করে শাবানের দিনগুলোতেই তা শেষ করা উচিত। কারণ এটিই হলো রমজানের প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬ 0
ছবি: সংগৃহীত
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে মহানবী (সা.)

দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা শুধু আধুনিক বিশ্বের নয়, অতীতেও ছিল। রসুল (সা.) এর সমাধানে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম নির্দেশনা ছিল-বেকার ব্যক্তিরা বসে না থেকে যেকোনো ধরনের কাজ ও পেশায় নিয়োজিত থাকা। নবীরাও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা মানুষের সামনে কর্মের এবং হালাল উপার্জনের উচ্চমানের আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। যেমন রসুল (সা.) হজরত দাউদ (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন’ (সহিহ বুখারি)।   কোনো বৈধ কাজই তুচ্ছ নয় রসুল (সা.) সব (বৈধ) কর্মকেই সম্মান, মর্যাদা ও গুরুত্বের চোখে দেখতেন। কেননা মানুষের কাছে হাত পাতা এবং তাদের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে নিজে কাজ করে খাওয়াই উত্তম। এ বিষয়টি রসুল (সা.) তাঁর হাদিসে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে- ‘তোমাদের কেউ যদি পিঠে করে কাঠের বোঝা বয়ে আনে এবং তা বিক্রি করে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার চেহারাকে (ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে) রক্ষা করেন, তার জন্য এটাই উত্তম-মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ানোর চেয়ে। যে হাত পাতার ফলে মানুষ তাকে কিছু দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)।   অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরিতে উৎসাহ প্রদান রসুল (সা.) বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরির ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের বর্গা চাষের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন দরিদ্র ও নিঃস্ব অবস্থায় মদিনায় আগত মুহাজির মুসলমানদের সঙ্গে আনসার সাহাবীরা করেছিলেন। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আনসার সাহাবিরা রসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আমাদের এবং আমাদের ভাইদের (মুহাজিরদের) মধ্যে খেজুরের বাগান ভাগ করে দিন।’   নবীজি (সা.) বললেন, ‘না।’ তখন তারা মুহাজিরদের বললেন, ‘আপনারা আমাদের বাগানে কাজ করুন, আমরা আপনাদের বাগানের ফলের মধ্যে অংশীদার করে নেব।’ তখন মুহাজিররা বললেন, ‘আমরা শুনলাম এবং মানলাম; অর্থাৎ তারা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন (সহিহ বুখারি)।   স্বনির্ভরতার এক চমৎকার গল্প দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনের এসব নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দারুণভাবে জাগিয়ে তুলতেন রসুল (সা.)। এ ক্ষেত্রে চমৎকার ও একটি শিক্ষণীয় গল্প ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। হজরত আনাস (রা.) বর্ণিত : একবার এক ব্যক্তি এসে নবীজি (সা.)-এর কাছে হাত পাতল। নবীজি (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ঘরে কি কিছু নেই?’ লোকটি বলল, ‘একটি গালিচা আছে, যার কিছু অংশ আমরা পরিধান করি এবং কিছু অংশ বিছিয়ে রাখি। একটি পাত্রও আছে, তাতে আমরা পানি পান করি।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘সেগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো।’ লোকটি সেগুলো নিয়ে এলে মহানবী (সা.) তা হাতে নিয়ে বললেন, ‘এ দুটি কে ক্রয় করবে?’ এক ব্যক্তি বলল, ‘আমি এগুলো এক দিরহামে ক্রয় করব।’ নবীজি (সা.) তখন আরও দুইবার অথবা তিনবার বললেন, ‘কেউ কি এর অধিক মূল্য দেবে?’ আরেকজন বলল, ‘আমি দুই দিরহামে নেব।’ নবীজি (সা.) তখন ওই ব্যক্তিকে জিনিস দুটি দিয়ে তার থেকে দিরহাম দুটি গ্রহণ করলেন। এরপর সেই ব্যক্তিকে তা প্রদান করে বললেন, ‘এক দিরহাম দিয়ে খাবার কিনে পরিবার-পরিজনকে দাও এবং আরেক দিরহামে একটি কুঠারের ফলা কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ লোকটি তাই করল। এবার নবীজি (সা.) নিজ হতে সেই লৌহ কুঠারে একটি হাতল লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, তুমি এটা দিয়ে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং পনেরো দিন অতিবাহিত হওয়ার আগে আমার সঙ্গে আর দেখা করবে না।’ লোকটি কুঠার হাতে চলে গেল। কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করতে লাগল। পনেরো দিন পার হলে সে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলো। ইতোমধ্যে সে দশ দিরহাম উপার্জন করেছে। সে এর থেকে কিছু দিয়ে কাপড় এবং কিছু দিয়ে খাবার কিনল। এবার নবীজি (সা.) তাকে বললেন, ‘ভিক্ষার কারণে কেয়ামতের দিন মুখমণ্ডলে দাগ নিয়ে ওঠার চেয়ে এটাই তোমার জন্য উত্তম।’ এরপর নবীজি (সা.) আরও বললেন, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়ানো বৈধ নয়। ১. প্রচণ্ড দরিদ্র ব্যক্তি, ২. ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি এবং ৩. যার ওপর রক্তপণ আছে, অথচ সে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। (সুনানে আবু দাউদ : ১৬৪১)।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
যে ৭ বিপদ আসার আগে আমল করতে বলেছেন মহানবী (সা.)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা সাতটি জিনিস আসার আগে আগে দ্রুত আমলে লিপ্ত হও।    তোমরা কি অপেক্ষা করছ এমন দারিদ্র্যের, যা সবকিছু ভুলিয়ে দেয়? না এমন প্রাচুর্যের, যা অবাধ্য করে তোলে? না এমন রোগব্যাধির, যা অথর্ব করে তোলে? না এমন বার্ধক্যের, যা বুদ্ধি লোপ করে দেয়? না আকস্মিক আগত মৃত্যুর? না দাজ্জালের, সে তো এমন নিকৃষ্টতম অনুপস্থিত, যার আত্মপ্রকাশের অপেক্ষা করা হচ্ছে? না কিয়ামতের, যে কিয়ামত কিনা অত্যন্ত বিভীষিকাময় ও অতি তিক্ত? (তিরমিজি)   এ হাদিছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতকে আমলে যত্নবান হয়ে বর্তমান সময়কে কাজে লাগাতে উৎসাহ দিয়েছেন। বর্তমান সময়কে কাজে লাগানোই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকা চরম নির্বুদ্ধিতা। কেননা বর্তমানে যে সুযোগ আছে, ভবিষ্যতেও তা পাওয়া যাবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই।   ভবিষ্যতে যেকোনো কঠিন বাধা সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। অনেক বাধা এমন আছে, যার সম্মুখীন হলে আমল করার কোনো উপায় থাকে না।    এ হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেমন সাতটি বাধা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—১. অতি দারিদ্র্য।২. অতিরিক্ত ধনসম্পদ।৩. কঠিন রোগব্যাধি। ৪. অতি বার্ধক্য। ৫. আকস্মিক মৃত্যু। ৬. দাজ্জালের আবির্ভাব।৭. কিয়ামত।

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ৩১, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
আল্লাহভীতি মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য

সব প্রশংসা একমাত্র আল্লাহপাকের জন্য। অগণিত সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.), তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ওপর।   কল্যাণ ও সাঠিক পথ অনুসরণের দিকনির্দেশনা রয়েছে মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারিমে। এটি প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এ কিতাবে আমাদের রব মুত্তাকিদের একটি বিশেষ গুণের কথা জানিয়েছেন। যারা হবে তাঁর ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সম্মানের অধিকারী। আর এই গুণটি ইমানদারদের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য এবং ইমানের সারকথা। ইমানের বাহন এবং ইহসানের পর্যায়ে পৌঁছার সোপান। মহান আল্লাহ বলেন-‘আমি মুসা ও হারুনকে দিয়েছিলাম মীমাংসাকারী গ্রন্থ ও মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ, যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে এবং কিয়ামত সম্পর্কে থাকে ভীতসন্ত্রস্ত (আম্বিয়া : ৪৮-৪৯)।   কোরআনুল কারিমের সুরা ফাতির-এর ১৮ নম্বর আয়াত দ্বারা আল্লাহ বলেন, আপনি শুধু তাদেরই সতর্ক করুন, যারা তাদের রবকে না দেখে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে। আল্লাহ আরও বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই, কেবল তাঁকে ভয় করে (ফাতির-২৮)। আল্লাহর ভয় হলো : আল্লাহকে সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সম্পর্কে জেনে তাঁকে ভয় করা বান্দার কর্তব্য। এ ভয় তাঁর সুন্দর নাম ও উন্নত গুণাবলি, প্রশংসাযোগ্য হিকমতপূর্ণ কর্ম ও বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে তাঁকে ভয় করা। এটাই বাস্তবসম্মত এবং পরিপূর্ণ ভয়, যার অধিকারীদের কথা আল্লাহ উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা বুঝিয়েছেন। স্বীয় রব সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান যত বৃদ্ধি পাবে তাঁর প্রতি বান্দার ভয় তত বেশি তৈরি হবে। অবশেষে সে ইহসানের পর্যায়ে উন্নীত হবে। ফলে সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন সে তাকে দেখছে। জান্নাত এমন ব্যক্তিরই নিকটবর্তী হবে এবং তাকেই ক্ষমার প্রতিশ্রুতিমূলক সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, আর জান্নাতকে এত কাছে নেওয়া হবে, যার সঙ্গে মুত্তাকিদের কোনো দূরত্ব থাকবে না। এই প্রতিশ্রুতি প্রত্যেক আল্লাহ অভিমুখী হিফাজতকারীর জন্য, যারা গায়ের অবস্থায় দয়াময় আল্লাহকে ভয় করেছে ও বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়েছে (ক্বাফ-৩১) আরও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিশ্চয় যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার (মূলক-১২)। তাই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তাকে ভয় করে এমন বান্দারাই সতর্কবাণী থেকে উপকৃত হয়। কেননা তাদের ভয় সত্য, যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই। আর এমন ভয়ের অধিকারীদেরই কিয়ামতের ময়দানে নির্ভয়ে বিশ্ব প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নবীকুলের শিরোমণি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। এদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যাকে উচ্চবংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এই বলে তাকে প্রত্যাখান করে যে আমি আল্লাহকে ভয় করি। আরেকজন ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয় (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।   কোরআন ও সুন্নাহর দলিল প্রমাণ করে যে আল্লাহর ভয় দুই রকমের যা পরস্পর সংগতিপূর্ণ-এক. স্বীয় রবের ব্যাপারে বান্দার এই ভয়, যে তিনি তাকে কৃত গুনাহ অথবা ফরজ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি প্রদান করবেন। আর এ ভয়ের ফলে পাপকর্ম বর্জন করে চলা। যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করার পর আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে তওবা করে তার দিকে ফিরে আসে, সেও এই ধরনের ভয়ের অধিকারী। এই ধরনের ভয় কেবল তারাই করে যারা তাদের রবকে সম্মান প্রদর্শন করে। দুই. আল্লাহকে ভয় করার আরেকটি উপায় হলো তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলির মর্ম অনুধাবন করে তাঁর ইবাদত করা (সুরা : আল রাদ-৯-১০)। বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, মুমিন বান্দা আল্লাহর পথে খরচ করে ও দান করে। কিন্তু তার হৃদয়ে আশঙ্কা থাকে যে এটা তার রবের কাছে পৌঁছবে কি না? এমন ব্যক্তিই প্রকৃত মুমিন, কারণ সৎ আমল করা সত্ত্বেও সে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে না।   তাই আসুন! আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রকাশ্য, নির্জন ও সর্বাবস্থায় আপনার ভয়ে ভীত হওয়ার তওফিক দান করুন। যা আমাদের আপনার অবাধ্য হওয়ার পথে বাধা দেবে এবং আপনার ইবাদত পালনে উদ্বুদ্ধ করবে।

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ৩১, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
মোরাকাবা বা ধ্যানের গুরুত্ব

আরবি মোরাকাবা শব্দের অর্থ নজরে রাখা, পর্যবেক্ষণ করা, ধ্যান করা। এর প্রতিশব্দ হলো তাফাক্কুর, অর্থ চিন্তা করা, গভীরভাবে চিন্তা করা। ইংরেজিতে মোরাকাবাকে গবফরঃধঃরড়হ বলে। সব নবী-রসুল মোরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইসলামের আত্মিক অনুশীলনের মাধ্যম হচ্ছে মোরাকাবা। হজরত রসুল (সা.) দীর্ঘ ১৫ বছর হেরা গুহায় মোরাকাবা বা ধ্যান করে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। মোরাকাবারত অবস্থায় তাঁর কাছে পবিত্র কোরআনে সুরা আল আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। মোরাকাবার মাধ্যমেই রসুল (সা.) আল্লাহর পরিচয় লাভ করেন। রসুল (সা.) বলেন, ‘একবার আমি দীর্ঘ এক মাস হেরা গুহায় অবস্থান করলাম। অবস্থান শেষে গুহা থেকে বের হয়ে আমি খোলা ময়দানে চলছিলাম। পথিমধ্যে আমাকে আহ্বান করা হলো। আমি একে একে সামনে ও পেছনে, ডানে ও বামে তাকাতে লাগলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। অতঃপর আমাকে পুনরায় আহ্বান করা হলো। এবারও আমি কাউকে দেখলাম না। পুনরায় আহ্বান করা হলে, আমি মাথা তুলে দেখলাম- আমার মহান মালিক ঊর্ধ্বাকাশে আরশের ওপর অবস্থান করে আমাকে ডাকছেন। আমার শরীরে ভীষণ কম্পন শুরু হলো। আমি খাদিজা (রা.)-এর নিকট পৌঁছালাম এবং বললাম, আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করো। অতঃপর আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করা হলো। তারপর আমার ওপর পানি ছিটানো হলো। এ সময় আল্লাহ নাজিল করেন ‘হে কম্বলাবৃত রসুল! উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’ (তাফসিরে কুরতুবি-২১ নম্বর খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫)। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মোরাকাবার ফজিলত : আল্লাহ বলেন, ‘(তাঁরাই তত্ত্বজ্ঞানী) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর জিকির করে এবং আসমান জমিন সৃষ্টির বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।’ (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯১) মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে রসুল (সা.) বর্ণিত বহু হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গভীরভাবে চিন্তা করা বা মোরাকাবার সমতুল্য কোনো ইবাদত নেই’ (তাফসিরে মাজহারি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০)। তিনি আরও বলেন, ‘রাত ও দিনের পরিবর্তনকারী আল্লাহকে নিয়ে এক ঘণ্টা মোরাকাবা করা ৮০ বছরের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’ (তাফসিরে মাজহারি, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১০)। মোরাকাবার মাধ্যমে বান্দার অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি তৈরি হয়। এতে ইবাদতের একাগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। রসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করার পদ্ধতি ৪টি। ১। গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর মোরাকাবা করা, ২। কল্যাণজনক কাজ করা, ৩। কিয়ামতের ব্যাপারে চিন্তা ও গবেষণা করা এবং ৪। আল্লাহর সমীপে মোনাজাত করা। (কালিমাতুর রাসুলিল আজম (সা.), পৃষ্ঠা ৯৪)। মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ওই আয়াতগুলো সম্পর্কে, যে আয়াতগুলো তাঁর কাছে অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহর বাণী- ‘এরূপ লোকেরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে, সেখানে তাদের দেওয়া হবে অফুরন্ত রিজিক।’ হজরত আলী (রা.) জবাবে বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহর ফরমান, ‘আমার সম্মান প্রদর্শন হয়েছে অথবা আমার বন্ধুত্ব অবধারিত হয়েছে তাদের জন্য, যারা আমার মোরাকাবা করেছে, আমার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি মহব্বত রেখেছে, কিয়ামত দিবসে তাদের চেহারা নুরানি হয়ে যাবে, তারা নুরের মিম্বরে অবস্থান করবে। তাদের দেহে থাকবে সবুজ পোশাক। আরজ করা হলো, ইয়া রসুল (সা.) তারা কারা? তিনি বলেন, তারা নবীও নন, শহীদও নন, বরং তারা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ওপর ভালোবাসা স্থাপন করেছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন স্বীয় রহমতে আমাদের তাদের দলভুক্ত করে দেন (মুসনাদে ইমাম আলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩ ও ২২৪)। হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) তাঁর ‘গুনিয়াতুত তালেবিন’ কিতাবে উল্লেখ করেন- ‘মোরাকাবা দ্বারা মুজাহাদার পরিপূর্ণতা সাধিত হয়। ফেরেশতা জিবরাইল হুজুরে পাক (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করেন যে, ইহসান কী? হুজুরে পাক (সা.) জবাবে বলেন, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহ দেখছেন। আর যদি তোমার অবস্থা তেমনটা না হয়, তবে মনে করবে যে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে দেখছেন। মোরাকাবা এটিই, বান্দা ইয়াকিন রাখবে যে, আল্লাহ তার সবকিছুরই খবর রাখেন। সদা-সর্বদা বান্দার মনে এই কথাটা জাগ্রত থাকার নামই মোরাকাবা। বান্দার জন্য যত রকম ভালো এবং কল্যাণকর বস্তু রয়েছে, সবকিছুর মূল হলো মোরাকাবা। সালেকের গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য মোরাকাবা হলো প্রধান অবলম্বন।’ (গুনিয়াতুত তালেবিন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৬ ও ২৫৭)। প্রখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক ড. কুদরত এ খোদা বলেন, ‘যে ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর পরিচয় জানা যায়, তাদের নির্দেশমতো চলা যায় ও সৃষ্টির তত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায়, তাকেই মোরাকাবা বলে।’

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ২৪, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
জানা গেল পবিত্র রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ

প্রতিবছরের মতো আবারও নিকটে চলে এসেছে পবিত্র রমজান মাস। আর প্রায় এক মাস পরই শুরু হতে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সিয়াম সাধনা ও ইবাদতের এই মহিমান্বিত মাস। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করেই রমজানের শুরু নির্ধারিত হবে।   দুবাইয়ের ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড চ্যারিটেবল অ্যাকটিভিটিজ ডিপার্টমেন্টের প্রকাশিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, আগামী ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে। সে হিসেবে ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজানের সম্ভাব্য প্রথম দিন হিসেবে ধরা হচ্ছে। এ বিভাগের ২০২৬ সালের সরকারি ছুটি ও ধর্মীয় দিবসের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হতে পারে ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার)। সে ক্ষেত্রে পরদিনই মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হতে পারে। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুসারে রমজান মাস ১৯ মার্চ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে এ মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনের হতে পারে। উল্লেখ্য, হিজরি বর্ষ গণনা করা হয় চাঁদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে চলছে রজব মাস, আর হিজরি মাস সাধারণত ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। এদিকে বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস রমজান।

মোঃ ইমরান হোসেন জানুয়ারী ১৫, ২০২৬ 0
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস বাস্তবায়ন কতদূর?

কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফের পাহাড়ঘেরা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ধুলোমাখা সেই পরিবেশে যখন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একসঙ্গে ইফতারের টেবিলে বসেন, তখন সেটি কেবল একটি মানবিক সৌজন্য ছিল না। বরং তা ছিল বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি এক শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা—যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে রোহিঙ্গা সংকটকে আলোচনায় টেনে আনার প্রয়াস।   এই সংকট নিয়ে আমরা এমন এক সময়ে উত্তর খুঁজছি, যখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় রক্তক্ষয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ব্যস্ত। ফলে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই একটি ‘বিস্মৃত ট্র্যাজেডি’তে পরিণত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য এটি কোনো মানবিক বিলাসিতা নয়—বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক সুপ্ত টাইমবোম। রোহিঙ্গারা কি কেবলই আশ্রিত এক উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী? ইতিহাসের পাতা উল্টালে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরব, পারস্য ও মুর বণিকদের হাত ধরে আরাকান উপকূলে যে মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, সেখান থেকেই রোহিঙ্গা জাতিসত্তার বিকাশ। তারা মিয়ানমারের মাটিতে কোনো বহিরাগত নয়; বরং তারা ওই ভূখণ্ডেরই আদিবাসী উত্তরসূরি। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ম্রাউক-ইউ রাজবংশের শাসনামলে এটি ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের উদাহরণ। বৌদ্ধ রাজারা মুসলিম উপাধি গ্রহণ করতেন, রাজদরবারে বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা হতো। মহাকবি আলাওল ও মাগন ঠাকুরের মতো সাহিত্যিকেরা এই রাজদরবারের গৌরব ছিলেন। মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তারা সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ আজ যাদের ‘রাষ্ট্রহীন’ বলা হচ্ছে, তারা একসময় রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ ছিলেন। তাই রোহিঙ্গাদের অধিকার কেবল মানবিক নয়—এটি ঐতিহাসিক ও আইনি অধিকার। এই জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের সূচনা হয় ১৭৮৪ সালে, যখন বর্মী রাজা বোডাওপায়া আরাকান দখল করেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে নাগরিক অধিকার হরণ, সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। ১৯৪২ সালের দাঙ্গা, ১৯৭৮ সালের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযান—প্রতিবার একই কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। নাফ নদী আজ কেবল সীমান্ত নয়; এটি রোহিঙ্গাদের রক্ত ও কান্নার সাক্ষী। বড় পরিহাস হলো—মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নিজেরাই এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে নেপিডোর প্রতি অনুগত ছিল এবং কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদে জড়ায়নি। বরং তারা ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে নাগরিক অধিকার চেয়েছে। এই অনুগত জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে জান্তা রাখাইন রাজ্যে নিজের শক্ত ভিত্তিটাই ধ্বংস করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে ক্ষমতার শূন্যতা, যার সুযোগ নিয়েছে আরাকান আর্মি। আজ রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অতীত কূটনৈতিক ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালের সংকটে তৎকালীন সরকার মানবিক আবেগ ও আন্তর্জাতিক ইমেজ নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দিলেও শক্ত কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে যেভাবে মিয়ানমারকে বাধ্য করা হয়েছিল দ্রুত প্রত্যাবাসনে, সেই দৃঢ়তা তখন দেখা যায়নি। এর ফল আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে জনতাত্ত্বিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা। বর্তমানে মিয়ানমার কার্যত একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র। দেশটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জান্তা বাহিনী কোণঠাসা, আর বিদ্রোহীরা সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কাদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করবে—ক্ষমতাহীন জান্তা নাকি আরাকান আর্মি? এই দ্বিধাই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ। চীন তার কিয়াকপু বন্দর ও পাইপলাইনের নিরাপত্তা চায়, ভারত তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির স্বার্থ রক্ষা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটকে চীনের বিরুদ্ধে চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। এই বাস্তবতায় মানবিকতা গৌণ হয়ে পড়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের ইফতার আয়োজন ছিল একটি প্রতীকী বার্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বহাল রেখে কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। সমাধান কোথায়? উত্তর লুকিয়ে আছে এক ভিন্নধর্মী কূটনীতিতে। বাংলাদেশকে বুঝতে হবে, রাখাইনে জান্তা আর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক নয়। তাই ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে আরাকান আর্মিসহ সব প্রাসঙ্গিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং রোহিঙ্গাদের নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।   রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, সীমান্ত অস্থিরতা তত বাড়বে। তাই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নাগরিকত্বসহ মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই হতে পারে এই দীর্ঘ ট্র্যাজেডির একমাত্র টেকসই সমাধান।

মোঃ ইমরান হোসেন জানুয়ারী ০৭, ২০২৬ 0
দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন
দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন

অর্থনৈতিক চাপ, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে দারিদ্র্য বাড়ে। এ ছাড়া, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ, বৈষম্যমূলক নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং একটি নির্দিষ্ট দারিদ্র্যের চক্রের কারণেও দারিদ্র্য বাড়ে। দারিদ্র্য বাড়ার আরেকটি কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যা দরিদ্র পরিবারগুলোকে আরও দরিদ্র করে তোলে। এরপর আছে কর্মসংস্থান সংকট। পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং মন্দার কারণে চাকরি হারানোর ফলে আয়ের উৎস কমে যায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য সুবিধাভোগীরা আরও বেশি সুবিধা পায়, কিন্তু অনেক দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষ প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত হয়। সঠিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মানুষ ভালো চাকরি পায় না এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। বন্যা, খরা, ঝড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ সুদের ঋণ বা অন্যান্য ঋণের জালে আটকা পড়া দারিদ্র্য আরও বাড়িয়ে তোলে। জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম হারে মজুরি বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা কম এসব সমস্যা তো অর্থনীতিতে আছেই। তবে বর্তমান সরকারের সময় যুক্ত হওয়া বড় দুটি উপাদান হচ্ছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এতে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। এ কারণে অর্থনীতি গতিহীন, বিনিয়োগ নেই, হয়নি বাড়তি কর্মসংস্থান। ফলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিও সামান্য। সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার বেড়ে ২৬ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারকে দায়ী করা যায়। বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০২৩ সালে ২৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৬ লাখ ২০ হাজার হয়েছে। বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ৪.৪৮ শতাংশ। এটি ২০২৩ সালের ৪.১৫ শতাংশ থেকে বেশি। অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৩তম আইসিএলএসের ভিত্তিতে বিবিএসের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক জরিপ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের শ্রমশক্তি ছিল ৭ কোটি ৬ লাখ নারী-পুরুষ। জরিপের সময় দেশে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার নারী-পুরুষ আগের সাত দিনে এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করেছে। অর্থাৎ, তারা কর্মে নিয়োজিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার এবং নারী ২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। যারা কর্মে নিয়োজিত নয় কিন্তু বেকার হিসেবেও বিবেচিত নয়, তারাই মূলত শ্রমশক্তির বাইরের জনগোষ্ঠী। এ জনগোষ্ঠীতে আছে শিক্ষার্থী, অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক, কাজ করতে অক্ষম, অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মে নিয়োজিত নয় বা নিয়োজিত হতে অনিচ্ছুক এমন গৃহিণীরা। উল্লেখ্য, প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে ১৩-১৪ লাখ মানুষের দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয়। বাকিরা কাজের জন্য প্রবাসে যায়। তাই দুই দশক ধরে বেকারের সংখ্যা মোটামুটি ২৪-২৮ লাখের মধ্যেই রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৭৩৮ মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ তথ্য দিয়েছে। এ হিসাবে সাময়িক হিসাব থেকে মাথাপিছু আয় ৪৬ ডলার কমে গেছে। সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৮৪ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চূড়ান্ত হিসাব দিয়েছে। সেখানে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও কমেছে। এক বছরে বেকার বেড়েছে দেড় লাখ। ২০২৫ চূড়ান্ত হিসাবমতে, দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালে এটি ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। দেশে তিন মাসে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার। ২০২৫ সব মিলিয়ে এক বছরের ব্যবধানেও দেশে বেকার বেড়েছে। ২০২৪ সালে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ সাফল্য দেখালেও ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে। এ সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও সেটি তুলনামূলক কম অন্তর্ভুক্তিমূলক। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা। বর্তমানে দেশের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি একেবারে স্থবির হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যারা কর্মসংস্থানে রয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেক কম মজুরিতে কাজ করছে। ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক এ তথ্য উল্লেখ করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সময়ে চরম দারিদ্র্য ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য যে কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আবারও দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা, ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে গেছে। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ থেকে ২০২২—এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করেছে। ফলে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং আরও ৯০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশনের মতো জরুরি সেবাগুলো পাওয়া সহজ হয়েছে। তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে। ২০১৬ সালের পর থেকে তুলনামূলকভাবে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপথ বদলে গেছে। দেখা গেছে, প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা, ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে গেছে। কৃষির ওপর ভর করে গ্রামীণ এলাকাগুলো দারিদ্র্য হ্রাসে নেতৃত্বের ভূমিকায় চলে গেছে। একই সময়ে শহরে দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চাইলে সবচেয়ে জরুরি হবে দারিদ্র্যবান্ধব, জলবায়ু-সহিষ্ণু এবং কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণ।’ লাখ লাখ বাংলাদেশির জন্য দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি মাধ্যম অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন। প্রবাস আয় দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করেছে, তুলনামূলকভাবে গরিব পরিবার এটা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। কিন্তু দেশে অভিবাসী হওয়া কর্মীরা শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় জীবনযাপন করে, যেখানে জীবনযাত্রার মান নিম্ন। আর সচ্ছল পরিবার ছাড়া আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুযোগ নেওয়া যায় না, কেননা বিদেশ যাওয়ার খরচ খুবই বেশি। যদিও বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বেড়েছে তবে সেখানে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং উপকারভোগী নির্বাচন লক্ষ্যভিত্তিক নয়। দেখা গেছে, ২০২২ সালে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পাওয়াদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই ধনী পরিবার যেখানে অতি দরিদ্র পরিবারের অর্ধেকও এই সুবিধা পায়নি। তা ছাড়া, ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বেশিরভাগ সময়েই লক্ষ্যভিত্তিক হয় না, এমনকি বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং সারে সরকার যে ভর্তুকি দেয়; তার সিংহভাগ অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো পায়। দারিদ্র্য এবং বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে এমন চারটি প্রধান নীতিগত করণীয় চিহ্নিত করেছে এ প্রতিবেদন। এগুলো হলো—উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের ভিত্তি মজবুত করা, দরিদ্র এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বেশি করে শোভন কাজের ব্যবস্থা করা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-সহায়ক বিধিবিধান তৈরি করে দরিদ্রবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী রাজস্ব নীতি ও কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা শক্তিশালী করা। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এবং প্রতিবেদনটির অন্যতম লেখক সার্জিও অলিভিয়েরি বলেন, ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক বৈষম্য, বিশেষ করে পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য বেশ কমিয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আঞ্চলিক বৈষম্য, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দারিদ্র্য মূল্যায়ন দেখিয়েছে যে, উদ্ভাবনী নীতি গ্রহণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, শহরে গুণগত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিতে দরিদ্রবান্ধব মূল্য-শৃঙ্খল নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসের গতি পুনরুদ্ধার ও ত্বরান্বিত করতে পারে এবং সমৃদ্ধিতে সবার অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারে।’ লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন

মোঃ ইমরান হোসেন ডিসেম্বর ১২, ২০২৫ 0
যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন
যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন

হাসপাতালের সংকটময় বিছানায় শুয়ে থাকা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চারপাশে এখন সমগ্র জাতি নিঃশব্দ প্রার্থনায় নিমগ্ন। দল-মত-ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ভুলে সবাই তার জন্যই হাত তুলছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ পর্যন্ত সবার হৃদয়ে একই মিনতি—তিনি সুস্থ হোন।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেতার অসুস্থতা নিয়ে এমন সামষ্টিক আবেগ, এমন ঐক্যের বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। এই দৃশ্য বলে দেয়, খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের মানুষের গভীরতম মানবিক অনুভূতির প্রতীক। এই ভালোবাসা, এই ঐক্যের উৎস শুধুই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নয়; উৎস তার চরিত্রে, তার মহত্ত্বে, তার অসীম সহিষ্ণু ও নিঃস্বার্থ হৃদয়ে। খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি ক্ষমতায় থেকেও প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করেননি আর ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিদ্বেষকে রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত বছরগুলোয় তার আচরণ বারবার দেখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসা, দেশকে ভালোবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা—এগুলোই তার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। তিনি চাইলে ভিন্ন জীবন বেছে নিতে পারতেন। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে তিনি বিলাস-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা জীবন কাটাতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। তিনি প্রবেশ করেছিলেন রাজনীতির অনিশ্চিত গোলকধাঁধায়—শুধু জনগণের কল্যাণের টানে, গণতন্ত্রের দায়ে। এটি ছিল ত্যাগের সিদ্ধান্ত, কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ, তবুও দৃঢ়। গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই শুধু এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৯ বছরব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী দমনপীড়নের বিরুদ্ধেও ছিল তার দীর্ঘ, নিরলস সংগ্রাম। জীবনের বহু সময় জেল, মামলা, গৃহবন্দিত্ব, অপমান, অপবাদ—সব তিনি সহ্য করেছেন এ বিশ্বাসে যে, গণতন্ত্রের আলো নিভে যেতে নেই। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে—এ আদর্শই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের সামনে তিনি কখনো মাথা ঝোঁকাননি। রাজনীতির ইতিহাসে খুব কম মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতার মোহ ছেড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এতটা নিষ্ঠা ও স্থিতি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত একটি দলকে সংগঠিত করে তিনি যেভাবে পুনর্গঠন করেছিলেন, তা ছিল এক নীরব বিপ্লব। অভিজ্ঞতা কম থাকলেও নেতৃত্বের শক্তি ছিল তার ব্যক্তিত্বে, সৎ ইচ্ছায়, ধৈর্যে। বিএনপিকে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদ ছিল দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতা বা পদ নয়; সবচেয়ে বড় অর্জন দেশের মানুষের স্নেহ, আস্থা ও শ্রদ্ধা। এ শ্রদ্ধার গভীরতা আজ অসুস্থতার মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন মানুষ যখন হাসপাতালের বিছানায় শায়িত হয়ে দেশের মানুষের মনোভূমিকে এমনভাবে একত্রিত করে ফেলেন, সেটিই হয়ে ওঠে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে সত্যিকারের মূল্যায়ন। তার জীবনে দুঃখ, সংগ্রাম, ক্ষতি ছিল প্রচুর। নিজের ও পরিবারের ওপর আঘাত আসবে জেনেও তিনি গণতন্ত্রের পথ ছাড়েননি। তার দুই পুত্রকে হারানো—একজনের মৃত্যু, একজনের দীর্ঘ নির্বাসন— এসবই ছিল তার জীবনের গভীরতম ক্ষত। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। মহৎ হৃদয়ের মানুষরা সাধারণত ভেঙে পড়েন না—তারা নীরবে লড়াই করেন, কারও ক্ষতি চান না, কিন্তু অন্যায়ের কাছে নতও হন না। খালেদা জিয়ার জীবন তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ। আজ যখন তিনি মৃত্যুপথযাত্রার মতো এক ভয়াবহ অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তখন জাতি বুঝতে পারছে—এ নারীর জীবন শুধু একটি রাজনৈতিক গল্প নয়; এটি এক অধ্যবসায়, সহিষ্ণুতা, মানবিক মর্যাদা ও ত্যাগের মহাকাব্য। সামাজিক মাধ্যমে যে অভূতপূর্ব দোয়া-প্রবাহ দেখা গেছে, তা কোনো প্রচারণার ফল নয়; এটি হৃদয়ের সাড়া। যারা কখনো তাকে ভোট দেননি, যারা তার দলকে সমর্থন করেন না, তারাও আজ প্রার্থনার অংশ হয়ে গেছেন—এটাই এক নেত্রীকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রমাণ। মানুষের ভালোবাসা কখনো মিথ্যা হয় না। রাজনীতির গল্প বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে স্থান, তা যুগ পেরিয়েও থেকে যায়। আজ বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল স্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মানবিক চরিত্রই তার পরিচয়। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির ঐক্যের প্রতীক—এ এক আশ্চর্য, অথচ গভীর সত্য। জাতি তার সুস্থতা কামনা করছে শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়, একটি ইতিহাসের জন্য, একটি আদর্শের জন্য, একটি মানবিকতার জন্য। তিনি যে পথ দেখিয়েছেন—সাহসের, ধৈর্যের, ন্যায়ের, আপসহীনতার; সে পথই আজ মানুষের মনে আলো জ্বেলে যাচ্ছে। রাজনীতিতে অনেকেই ক্ষমতার চূড়ায় ওঠেন, কিন্তু খুব কম মানুষ মানুষের হৃদয়ে থাকেন। খালেদা জিয়া সেই বিরল জননীসুলভ নেত্রী, যিনি পরিণত বয়সে, অসুস্থতার বিছানায় থেকেও জাতিকে একত্রিত করতে পেরেছেন। সেই ঐক্যই আজ তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। এই প্রার্থনা-ভরা সময়ই তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মোঃ ইমরান হোসেন ডিসেম্বর ১২, ২০২৫ 0
ছবি : সংগৃহীত
চাকরি ও কর্পোরেট দুনিয়ায় বেতনব্যবস্থা কীভাবে এলো

দৈনন্দিন চাকরিজীবনের অন্যতম পরিচিত শব্দ—‘বেতন’। কিন্তু এই বেতনব্যবস্থা কি সবসময় এমন ছিল? করপোরেট দুনিয়ায় মাস শেষে টাকা পাওয়ার যে আধুনিক ব্যবস্থা, তা আসলে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ফল। ইতিহাসের প্রথম বেতনব্যবস্থা পাওয়া যায় আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালে। মেসোপটেমিয়ার শহর–রাষ্ট্র উরুক, ব্যাবিলন ও সুমের অঞ্চলে শ্রমিকরা দিনের কাজের বিনিময়ে শস্য, যব বা রৌপ্যের পরিমাপ পেত। এই বেতন হিসাব করা হতো কাদার ফলকে কিুনিফর্ম লিপিতে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের পাওয়া নথিতে যুক্ত আছে শ্রমিক কতটুকু যব পেল—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব। তাই বলা যায়, বেতনের ‘আবিষ্কার’ কোনো ব্যক্তির নয়; বরং একটি সভ্যতার সাংগঠনিক ব্যবস্থার ফল। রোমান সাম্রাজ্যের সময় সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ বা লবণ কেনার ভাতা দেওয়া হতো। লাতিন ভাষায় লবণ—‘সাল’; সেখান থেকেই আসে ‘সালারিয়াম’। আজকের ‘বেতন’ শব্দের ধারণা মূলত এই ‘সালারিয়াম’ থেকেই বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। রোমানরা প্রথম বুঝেছিল যে অর্থনীতি চালাতে হলে শ্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা, কর কাঠামো তৈরি, আর্থিক প্রশাসনের উন্নয়ন—সব মিলিয়ে তারা বেতনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করে তোলে। মধ্যযুগে ইউরোপে গড়ে ওঠে গিল্ড ব্যবস্থা—কারিগর, কাঠমিস্ত্রি, ধাতু শ্রমিক, তাঁতি—সবাই গিল্ডে যোগ দিয়ে নির্দিষ্ট হারে বেতন পেত। এই সময় প্রথমবারের মতো বেতনের মধ্যে যুক্ত হয় দক্ষতার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, এক সমান কাজে এক সমান মজুরি এবং শিক্ষানবিশ/প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পারিশ্রমিক। এগুলো পরবর্তীকালের শ্রম আইনের ভিত্তি তৈরি করে। ১৭৫০-১৯০০ সাল পর্যন্ত শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকরা গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে। কারখানার মালিকদের প্রয়োজন হয় শ্রমিক ধরে রাখা, নিয়মিত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কর্মী দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগে বাধ্য করা। এসব কারণে তৈরি হয় মাসিক বেতন, সাপ্তাহিক মজুরি, অতিরিক্ত সময়ের মজুরি (ওভারটাইম), বেতন কাটতি, বোনাস ও চুক্তিভিত্তিক বেতন স্কেল। কারখানার মালিকরা বুঝতে পারে—নিয়মিত বেতন দিলে শ্রমিক থাকবে, উৎপাদনও বাড়বে। এটাই আধুনিক করপোরেট বেতনব্যবস্থার ভিত্তি। ২০শ শতকের শুরুতে টেইলর, ফোর্ড ও ওয়েবারের মতো গবেষকেরা যখন আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান তৈরি করলেন, তখন বেতন হয়ে গেল সংগঠনের অন্যতম কৌশলগত উপাদান। তাদের গবেষণায় দেখা গেল—উচ্চ বেতন উচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করে, কর্মদক্ষতা–ভিত্তিক বেতন কর্মীদের প্রণোদনা বাড়ায় এবং বেতনের স্বচ্ছতা কর্মক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করে। এরপর তৈরি হয় মানবসম্পদ বিভাগ, বেতন গ্রেড, বেতন স্কেল, কর্মদক্ষতা সূচকভিত্তিক বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড, অবসরভাতা ও ভাতাব্যবস্থা। আজকের করপোরেট বেতনব্যবস্থা তাই পাঁচ হাজার বছরের যাত্রার ফল। উপসংহারে বলা যায়, বেতনের ইতিহাস শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি সভ্যতার বিবর্তন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক করপোরেট নীতির সমন্বিত ফল। মানুষের শ্রমের মূল্যায়নের এই যাত্রাই ধীরে ধীরে বেতনব্যবস্থাকে করেছে আরও বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক  

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৮, ২০২৫ 0
ঐতিহাসিক সত্যের আলোকপাত: ফেরাউন ও রোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী

ধর্মীয় গ্রंथে ইতিহাস কখনো কখনো প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোরআনের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা নিখুঁতভাবে পরবর্তী সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। ফেরাউনের দেহ সংরক্ষণ কোরআনে বলা হয়েছে— “আজ আমি তোমার দেহকে সংরক্ষণ করবো, পরবর্তী যুগের জন্য নিদর্শন হিসেবে।” মিশরের ফেরাউন মুমিনাহ ছিল অজানা, কিন্তু ১৮৯৮ সালে মমি আবিষ্কার হলে— •শরীর অক্ষত •লাল সাগরে ডুবে মৃত্যুর প্রমাণ •কোরআনের বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি হয় রোমানদের পরাজয়–বিজয় ভবিষ্যদ্বাণী সূরা রূম–এ বলা হয়— “রোমানরা পরাজিত হলেও শীঘ্রই বিজয়ী হবে।” ইতিহাস দেখায়— •পারসিকদের কাছে রোমানরা পরাজিত হয়েছিল •ঠিক নয় বছরের মাথায় তারা আবার বিজয় অর্জন করে এ ঘটনাটি কোরআনের বর্ণনার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। লোহা—মহাজাগতিক উৎস থেকে আগত কোরআনে বলা হয়েছে— “লোহা নাযিল করেছি”—অর্থাৎ আনা হয়েছে। বিজ্ঞান দেখায়— •    পৃথিবীর কেন্দ্রের লোহা উল্কাপিণ্ড থেকে এসেছে •    সুপারনোভার বিস্ফোরণে লোহা উৎপন্ন হয় •    স্পেস ডাস্ট হয়ে পৃথিবীতে পড়ে এটি সপ্তম শতকের জ্ঞানের বাইরে। ফুটনোট: ১. British Museum Egyptology Papers ২. Roman–Persian War Chronicles ৩. Journal of Astrophysics   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৫, ২০২৫ 0
আঙুলের ডগায় পরিচয়ের চাবিকাঠি: কোরআন ও আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান

মানুষের আঙুলের ছাপ। আজ এটি পরিচয়ের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু কোরআনে শতাব্দী আগেই বলা হয়েছিল— “আমি মানুষের আঙুলের ডগা পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে সক্ষম।” এই উক্তি আজ বিজ্ঞানসম্মতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফিঙ্গারপ্রিন্ট কেন অনন্য? আধুনিক forensic science দেখায়— •    পৃথিবীতে কোনো দুই মানুষের আঙুলের ছাপ এক নয় •    যমজ সন্তানেরও নয় •    আঙুলের ডগায় ৪০টির বেশি অনন্য প্যাটার্ন থাকে •    মৃত্যুপরবর্তী অবস্থাতেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তযোগ্য আঙুলের ডগার এই অনন্যতা ১৯শতকেও অজানা ছিল। সপ্তম শতকে তো কল্পনাই অসম্ভব। ফিঙ্গারপ্রিন্ট: অপরাধ বিজ্ঞান বিপ্লব •    অপরাধী শনাক্ত •    জীবিত–মৃতদেহ শনাক্ত •    বর্ডার সিকিউরিটি •    মিলিটারি আইডেন্টিফিকেশন সবই আজ আঙুলের ডগা ভিত্তিক। কেন কোরআনের উল্লেখ বিশেষ? কারণ— •    আঙুলের ডগা মানব শরীরের অন্যতম ক্ষুদ্রতম অংশ •    এতে পরিচয়ের তথ্য সংরক্ষিত •    আধুনিক বায়োমেট্রিকস–এর ভিত্তি ফিঙ্গারপ্রিন্ট কোরআনের বর্ণনা আধুনিক forensic identification system-এর সাথে উল্লেখযোগ্য সামঞ্জস্য রাখে। ফুটনোট: ১. FBI Forensic Handbook ২. Journal of Identity Science   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৩, ২০২৫ 0
সমুদ্রের অদৃশ্য পর্দা: আধুনিক মেরিন সায়েন্সের বিস্ময়

সমুদ্র পৃথিবীর ৭১ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু সমুদ্রের গভীর রহস্য মানুষ সামান্যই জানে। কোরআনে সমুদ্রের মধ্যে ‘প্রতিবন্ধক পর্দা’ বা ‘অদৃশ্য বাধা’র কথা কয়েকবার এসেছে—যা শতাব্দী পরে মেরিন সায়েন্সে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। লবণাক্ত ও স্বাদু পানির বিভাজন কোরআনে বলা হয়— দুই সমুদ্র পাশাপাশি বয়ে চলে, কিন্তু তাদের মাঝে আছে এক প্রতিবন্ধক—যা তারা অতিক্রম করে না। বিজ্ঞান দেখায়— •    নদীর স্বাদু পানি যখন সমুদ্রে মেশে, তখন ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে “halocline barrier” বা “salinity barrier” তৈরি হয় •    দুই পানি সম্পূর্ণ মিশে না মনে হয় যেন এক অদৃশ্য পর্দা তাদের আলাদা করে রেখেছে। সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ (Internal Waves) আজকের oceanography দেখিয়েছে— •    সমুদ্রে এমন তরঙ্গ আছে যা উপরে দেখা যায় না •    এগুলো ২০০–৩০০ মিটার নিচে ঘটে •    এগুলো আলোর প্রবেশ ঠেকায় •    দুই স্তরের পানি মিশতে বাধা দেয় কোরআনে সমুদ্রের নিচে অন্ধকার স্তর, ঢেউয়ের পর ঢেউ—এই বিষয়গুলোরও উল্লেখ আছে। গভীর সমুদ্রের অন্ধকার সূরা নূর–এ বলা হয়েছে— সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার, তার উপরে ঢেউ, তার উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘ... আধুনিক গবেষণা দেখায়— •    ২০০ মিটারের গভীরতার নিচে আলো পৌঁছায় না •    গভীরে ঢেউ থাকতে পারে—internal waves •    আবহাওয়াজনিত মেঘ ঢেউয়ের উপর ঢেউ তৈরি করে এটি নিখুঁতভাবে আধুনিক বিজ্ঞানকে সাহায্য করে ব্যাখ্যা করতে। ফুটনোট: ১. Oceanography Journal, Vol. 36 ২. UNESCO Marine Science Reports   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, নভেম্বর ৩০, ২০২৫ 0
পর্বতমালা: পৃথিবীর স্থিতিশীলতার অদৃশ্য খুঁটি

পর্বতমালা পৃথিবীর সৌন্দর্যের অন্যতম মহান প্রাকৃতিক নিদর্শন। তবে শুধু সৌন্দর্য নয়—পৃথিবীর স্থায়িত্বে পর্বতের ভূমিকা আধুনিক ভূতত্ত্বের আবিষ্কারের আগে কেউ জানতো না। কোরআনে বহু আয়াতে পর্বতমালা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ আছে, যা ভূতাত্ত্বিক গবেষণার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। পর্বত “খুঁটি” বা “পেগ” কোরআনে বলা হয়েছে— “আমি পৃথিবীতে দৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছি, যাতে তা কাঁপে না।” আধুনিক geophysics বলছে— •    পর্বতের উপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশ কয়েকগুণ গভীর, যাকে বলে mountain roots •    এগুলো পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোকে স্থিতি দেয় •    ভূকম্পন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি ঠিক পেরেকের মতো—উপরে সামান্য, নিচে গভীর। প্লেট টেকটোনিক্স ও পর্বত গঠন পৃথিবীর ভূত্বক ১২টি বড় টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। যখন প্লেটগুলো ঠেলে দেয়— •    হিমালয় জন্ম নেয় •    আলপাইন বেল্ট তৈরি হয় •    অ্যান্ডিস পর্বতমালা গঠিত হয় পর্বত গঠনের এই প্রক্রিয়া কোরআনের বর্ণিত “স্থাপন” ধারণার সঙ্গে মিল রয়েছে। কেন পর্বত পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে? •    পর্বতসহ ভূত্বকের গভীর শিকড় mantle-এ নোঙর করে থাকে •    মাধ্যাকর্ষণ ভারসাম্য বজায় রাখে •    প্লেটের গতি নিয়ন্ত্রণ করে •    ভূত্বকের তাপমাত্রা, চাপ, ঘনত্ব ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে এই বৈজ্ঞানিক তথ্য সপ্তম শতকে কারও জানা ছিল না। পর্বত বৃষ্টি–চক্রে ভূমিকা আধুনিক ক্লাইমেট সায়েন্স দেখায়— •    পর্বত মেঘকে বাধা দেয় •    বৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করে নদীর জন্ম দেয় •    জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে কোরআনে পর্বতের এই ভূমিকারও উল্লেখ পাওয়া যায়।   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, নভেম্বর ২৯, ২০২৫ 0
ছবি : সংগৃহীত
ক্ষমাই সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ - হৃদয়কে মুক্ত করে যে মহৎ গুণ

মানুষের জীবনে অপমান, কষ্ট, অবহেলা এসবের মুখোমুখি হওয়া যেন অবধারিত। কারও একটি আচরণ, একটি কটু বাক্য বা একটি ভুল আমাদের হৃদয়ে দাগ কাটে। তখন মন চায় প্রতিশোধ নিতে, বদলা দিতে। কিন্তু প্রতিশোধ সবসময় ক্ষত সারায় না; বরং ক্ষতকে আরও গভীর করে। কিন্তু এমন এক প্রতিশোধ আছে, যা আঘাত না দিয়ে আরোগ্য দেয়, ঘৃণা না বাড়িয়ে হৃদয়কে প্রশান্ত করে— আর সেটি হলো ক্ষমা। ক্ষমা শুধু এক ধরনের আচরণ নয়; এটি হৃদয়ের মহত্ত্ব, ঈমানের আলো এবং চরিত্রের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য। ক্ষমাই মানুষকে সবচেয়ে বড় বিজয়ী করে তোলে। তাই তো বলা হয় ‘সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ হলো ক্ষমা।   কুরআনে ক্ষমার মর্যাদা ১. ক্ষমা শক্তির পরিচয় দুনিয়ায় যে ক্ষমা করে, তার পুরস্কার আল্লাহ নিজ হাতে রাখেন। আর আল্লাহর প্রতিদান কত মহৎ! আল্লাহ তাআলা বলেন— وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ سَیِّئَۃٌ مِّثۡلُهَا ۚ فَمَنۡ عَفَا وَ اَصۡلَحَ فَاَجۡرُهٗ عَلَی اللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیۡنَ ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ যালিমদের পছন্দ করেন না। (সুরা আশ-শুরা: আয়াত ৪০) ২. আল্লাহ ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন রাগ গিলে ফেলে অন্যকে ক্ষমা করা মহান আল্লাহর ভালোবাসার পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন— الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ الۡكٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَ الۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ‘যারা স্বচ্ছলতা ও অভাবের মধ্যে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানবদেরকে ক্ষমা করে : এবং আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪) হাদিসে ক্ষমার মহত্ব ১. ক্ষমা মানুষকে সম্মানিত করে ক্ষমা মানুষের চোখে নয়, বরং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— وما زادَ اللهُ عبدًا بعفوٍ إلا عزًّا ‘বান্দা ক্ষমা করলেই আল্লাহ তার মান–সম্মান বৃদ্ধি করেন। (মুসলিম ৬৭৫৭) ২. নবীজির চরিত্র—সকল অন্যায়ের উত্তরে ক্ষমা নবীজিকে (সা.) মানুষ কষ্ট দিলেও তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন, প্রতিশোধ নিতেন না। এটাই ক্ষমার সর্বোচ্চ উদাহরণ এক কথায় মহানুভবতার জ্যোতি। মক্কা বিজয়ের দিনে যারা তাকে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছিল, তিনি বললেন— اذهبوا فأنتم الطلقاء ‘তোমরা যাও, তোমরা সবাই মুক্ত। (ইবন হিশাম) ক্ষমা নিয়ে রয়েছে মনীষীদের বাণী— ১. হজরত ইমাম শাফি (রহ.) বলেছেন— ‘যে ক্ষমা করে দিল সে ঘৃণা থেকে মুক্ত হলো, আর ঘৃণা হলো হৃদয়ের রোগ। ২. হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেছেন— ‘শত্রুর উপর সর্বোত্তম বিজয় হলো তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ৩. হজরত হাসান আল-বাসরি (রহ.) ‘ক্ষমা এমন একটি গুণ, যা শুধু শক্তিশালী মানুষের পক্ষেই সম্ভব।’ ৪. হজরত ওমর ইবন আল-খাত্তাব (রা.) বলেছেন— ‘মানুষের উপর প্রতিশোধ সহজ; কিন্তু ক্ষমা করা শুধু মহত্ত্বের কাজ। ক্ষমা যে কারণে সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ— > কারণ ক্ষমা মানুষকে আঘাত দেয় না হৃদয়কে জিতে নেয় কারণ ক্ষমা রাগকে গলিয়ে শান্তি এনে দেয় কারণ ক্ষমা সম্পর্কের ভাঙনকে জোড়া লাগায় কারণ ক্ষমা আল্লাহর রহমত ডেকে আনে কারণ ক্ষমাকারী সবসময় সম্মানিত হয় কারণ ক্ষমা মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে ক্ষমা করলে মানুষ বড় হয় আঘাত নয়, ভালোবাসা জন্ম নেয়। আর সত্যিই প্রতিশোধ কখনো জয় নয়; ক্ষমাই প্রকৃত বিজয়।   পরিশেষে ক্ষমা হলো হৃদয়ের সেই আলো, যা মানুষের রাগ, কষ্ট এবং ঘৃণার অন্ধকার দূর করে দেয়। প্রতিশোধ ক্ষত গভীর করে, কিন্তু ক্ষমা ক্ষত সারিয়ে দেয়। আমরা যখন ক্ষমা করি, তখন অপরাধী নয় আমরাই প্রথম মুক্ত হই। ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করেন, সম্মান বাড়িয়ে দেন, শান্তি নাজিল করেন এবং জান্নাতের পথ সুগম করেন। তাই সম্পর্কের ভাঙন, জীবনের কষ্ট, মানুষের আচরণ সবকিছুর উত্তম প্রতিক্রিয়া হলো ক্ষমা। ক্ষমাই মানুষের মহত্ত্বের মাপকাঠি। আর ক্ষমাশীল হৃদয়ই আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় হৃদয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ক্ষমাশীলতার গুণে ভরপুর চরিত্র দান করুন। আমিন।

মোঃ ইমরান হোসেন নভেম্বর ২৮, ২০২৫ 0
বিগ ব্যাং থেকে প্রসারণশীল মহাবিশ্ব: কোরআনের কসমোলজি

মানব সভ্যতা মহাবিশ্বকে বুঝতে চেয়েছে কল্পনার দৃষ্টিতে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই। কিন্তু মহাবিশ্বের উদ্ভব ও তার গঠন এত দীর্ঘকাল রহস্যাবৃত ছিল যে, ২০শ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে এর উত্তর পাওয়া যায়নি। হাবল টেলিস্কোপ, কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স—এসবের আগে মহাবিশ্ব সম্পর্কিত কোনো জ্ঞানই ছিল কেবল অনুমাননির্ভর। এই প্রেক্ষাপটে কোরআনে বর্ণিত মহাবিশ্ব–সম্পর্কিত আয়াতগুলো বিজ্ঞানীদের মাঝেও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। বিগ ব্যাং ধারণা:   আকাশ ও পৃথিবী একত্র ছিল সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে— আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একত্র ছিল, পরে আমি তাদের পৃথক করেছি। বিজ্ঞান বলে— •    মহাবিশ্ব প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি singularity থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। •    এই বিস্ফোরণকে বলা হয় Big Bang। •    শুরুতে সবকিছু একই বিন্দুতে ছিল। কোরআনের এই বর্ণনা বিগ ব্যাং–এর মৌলিক ধারণার সাথে অসাধারণ মিল খায়। মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে সূরা যারিয়াতে বলা হয়েছে— “আমরা আকাশকে শক্তি দিয়ে নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমরা তা প্রসারিত করছি।” এডউইন হাবল ১৯২৯ সালে দেখান— •    দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। •    অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। কোরআনের যুগে মহাকাশ সম্পর্কে পৃথিবীবাসীর কোনো ধারণাই ছিল না। তবু মহাবিশ্বের বিস্তৃতি নিয়ে এরূপ ঘোষণা অলৌকিক বলেই বিবেচিত হয়। ধূলিকণার পর্দা ও মহাজাগতিক ধোঁয়া আরও এক স্থানে বলা হয়েছে— আকাশ একসময় ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ ছিল। এটি আজকের অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে “nebula theory” হিসেবে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে— •    নক্ষত্র ও গ্রহের জন্ম ধূলিকণার মেঘ থেকে। •    প্রাথমিক মহাবিশ্ব ছিল ধোঁয়াটে গ্যাসীয় মিশ্রণে আবৃত। পৃথিবীর সুরক্ষামূলক বায়ুমণ্ডল কোরআনে বলা হয়েছে, আকাশ (বায়ুমণ্ডল) পৃথিবীকে রক্ষা করে— •    মাইক্রো-মিটিওরাইট •    ক্ষতিকর বিকিরণ •    অতিবেগুনী রশ্মি থেকে আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে— •    ওজোন স্তর এবং বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণ পৃথিবীকে প্রতিদিন হাজারো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। তারা–পথ, কক্ষপথ, নিখুঁত গতিময়তা কোরআনে বারবার উল্লেখ আছে— •    সূর্য, চাঁদ, গ্রহ—সব “নিজ নিজ কক্ষপথে” ঘুরছে। সপ্তম শতকে যখন পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণাই সর্বজনস্বীকৃত ছিল, তখন কোরআনের এই বক্তব্য বৈপ্লবিক।   ফুটনোট: ১. NASA Astrophysics Division Reports ২. Hubble 1929: The Expanding Universe Paper ________________________________________ লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, নভেম্বর ২৭, ২০২৫ 0
Popular post
দেশের বাইরে পড়ার জীবনটা যেমন

দেশের বাইরে মানুষকে পড়তে আসা উচিত কি না—এ নিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক, ব্যক্তিগত নানা মত আছে। তবে আমার বিশ্বাস, সুযোগ থাকলে জীবনে একবার হলেও দেশের বাইরে পড়াশোনা করা উচিত। বিদেশে পড়লে একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়, সে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। চাইলে বিদেশে চাকরি করতে পারে, আবার চাইলে দেশে ফিরে অবদান রাখতে পারে—সেটলড হওয়াই একমাত্র লক্ষ্য নয়। কিন্তু যেটাই করুক, সে যে অভিজ্ঞতা বয়ে নিয়ে যায় সেটা অমূল্য হয়ে থাকে। তার দুনিয়াকে দেখার চোখ অন্যদের থেকে আলাদা হবে।    অনেকেই দেশে হোস্টেলে থেকেছেন, বাবা–মা থেকে দূরে থেকেছেন। কিন্তু বিদেশে এসে যে ধাক্কাটা লাগে, সেটা আলাদা। এখানে সবই একা সামলাতে হয়। অসুস্থ হলে মাথায় নিজেই পানি দিতে হয়। হাজারো চ্যালেঞ্জ, হাজারো স্ট্রাগল—সব একা নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াতে হয়।   দেশে একা থাকা আর বিদেশে একা থাকার তফাৎ এখানেই। দেশে জুতা ছিঁড়লে মুচি আছে, বিদ্যুৎ গেলে মেকানিক আছে, গাড়ি নষ্ট হলে সাহায্য মিলবে, রান্নার জন্য বুয়া পাওয়া যাবে। কিন্তু বিদেশে জুতা সেলাই করতে যে টাকা লাগে, তা দিয়ে নতুন দুই জোড়া কিনে ফেলা যায়। শেফ রাখতে চাইলে তার বেতনই আপনার বেতনের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাও দেশি স্বাদের রান্না নাও আসতে পারে।   এখানে এসে আমি নিজের সাইকেলের চাকা নিজেই ঠিক করেছি ইউটিউব দেখে, জুতা নিজে সেলাই করেছি, গাড়ি নষ্ট হলে নিজে শিখে ঠিক করেছি। রান্না শিখেছি—কারণ বছরের পর বছর নিজের হাতের রান্নাই খেতে হয়। এসব তো কেবল কয়েকটা উদাহরণ; সব বলতে গেলে বই হয়ে যাবে।   কঠিন পড়াশোনা আর গবেষণার পাশাপাশি বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আরও শত স্কিল শিখতে হয়। চ্যালেঞ্জ যতই থাকুক, মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে শিখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সহজ হয়ে আসে। আর এসব সংগ্রাম—এসবই মানুষকে শক্তিশালী, সক্ষম ও পরিণত করে তোলে। তাই প্রবাসজীবনে সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে অসংখ্য সুযোগ ও ইতিবাচক দিক।   দেশে আমার পরিচিত অসংখ্য বন্ধু–পরিচিত ‘বেকার’। রূপক অর্থে বেকার। অর্থাৎ চাকরি থাকলেও তারা কাজকে অর্থবহ মনে করে না, নিজের কর্মজীবন নিয়ে গর্বিত হতে পারে না। বড় চাকরি, ছোট চাকরি, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই বেশিরভাগ মানুষ সন্তুষ্ট না নিজের কাজ নিয়ে, না নিজের জীবনের মান নিয়ে।   কিন্তু বিদেশে এই বিষয়টা তুলনামূলক কম। এখানে নিজের পছন্দের কাজ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ অসীম—যদি আপনি সেই কাজের স্কিল শিখে নিতে পারেন। ক্যারিয়ারের মাঝপথে হঠাৎ মনে হলে যে আপনি অন্য কিছু করতে চান—এখানে সেটা ভাবার সাহস মানুষ দেখাতে পারে। নিজের জীবন নতুনভাবে গড়া এখানে সম্ভব।   এখানে আপনাকে আপনার কাজ দিয়েই বিচার করা হবে। ব্যক্তিজীবন নিয়ে খুব কমই মানুষ মাথা ঘামায়। রেসিজম আছে ঠিকই—কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার, কাউকে ‘কেনা গোলাম’ ভাবার প্রবণতা এখানে বিরল। আপনি নিজের কাজ ঠিকঠাক করলে কারো কাছে তোষামোদ করতে হবে না। নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করতে হবে না। এই পরিবেশ জীবনকে কম টক্সিক করে তোলে।   বাংলাদেশে তো পাসপোর্ট অফিসের পিয়নকেও ‘স্যার’ বলতে হয় ফাইলটা একটু ভেতরে ঢোকানোর জন্য—যা আমরা শ্রদ্ধা থেকে বলি না, বাধ্য হয়ে বলি।   দেশে–বিদেশে কোথাও প্রতিদিন অসাধারণ লাগবে না। কিন্তু প্রতিদিন অন্তত মনে হওয়া উচিত—আপনি কোনো অর্থবহ কাজে যুক্ত আছেন। যদি সেটা না হয়, তাহলে নিজের কাজ, নিজের স্থান, নিজের পরিবেশ—সবই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।   আপনি যদি নিজের কাজ নিয়ে, নিজের জায়গা নিয়ে, নিজের অবদান নিয়ে গর্ব করতে পারেন—তাহলে দেশে পরিবার–পরিজন নিয়ে জীবন কাটানোই শ্রেয়। আর সময়–সুযোগ পেলে একবার বিদেশে অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে—জব করে, মাস্টার্স বা পিএইচডি করে, কিংবা কিছুদিন ভ্রমণ করে। তবে দয়া করে—ব্যাচেলর/অনার্স লেভেলের পড়াশোনায় সন্তানকে বিদেশে পাঠাবেন না। আর ব্যাংক লোন নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করতে যাবেন না—এটা বাড়াবাড়ি।   লেখক : সাকলাইন মোস্তাক, পিএইচডি শিক্ষার্থী, যুক্তরাষ্ট্র

প্রতারণা মামলায় মিরপুরের বৈষম্য বিরোধী মামলা বানিজ্যের অন্যতম হোতা লুৎফুল বারী মুকুল গ্রেফতার

  অবশেষে গ্রেফতার করা হয়েছে মিরপুরের বৈষম্য বিরোধী মামলা বানিজ্যের অন্যতম হোতা লুৎফুল বারী মুকুলকে।     এক সময় মিরপুরের স্থানীয় বি এন পি-র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পরবর্তীতে নাসিম ও শাহেদা ওবায়েদের নেতৃত্বাধীন গড়বো বাংলাদেশ ও আসল বি এন পি নামের দুটি সংগঠনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বি এন পির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান তথা বি এন পি'র বিরুদ্ধে বিষোদগার এবং অপপ্রচারে লিপ্ত হন লুতফুল বারী মুকুল।   হঠাৎ করেই বিগত ৫ আগষ্ট ২০২৪ এর পর মুকুল নিজেকে বি এন পি'র নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করে।   এক যুগ পূর্বের বি এন পির  সাবেক পদবী ব্যবহার করে তার  তত্বাবধানে চাঁদাবাজি এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে অনেক নিরীহ ব্যবসায়ী ও কর্মজীবিদেরকে বৈষম্য  বিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদেরকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন এবং মামলা তুলে দিবেন এই মর্মে মোটা অংকের টাকা দাবী করে আসছিলেন।   ইতোপূর্বে মুকুলের জালিয়াতি ও প্রতারনার অনেক অজানা তথ্যও উঠে আসে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেষ্টিগেশন (পি বি আই) এর বিষদ এক তদন্ত রিপোর্টে। মুকুলের মামলা বাণিজ্যের শিকার সাভারের মাছুম তার প্রতি এই জুলুমের বিচার দাবী করেন।   অন্যান্য অভিযোগকারীরা জানান মুকুলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে  এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রতারণার মামলা চলমান।   মিরপুরের ভুক্তভোগী একজন প্রৌড়া বিধবা নারী বলেন, মুকুল ও তার মদদ দাতাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের  নিকট ইতোমধ্যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আরও তথ্য রয়েছে যে সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী ও বি এন পি'র হাই কমান্ডের নেতাদের নিকট মুকুল ও তাকে মদদদেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়াধীন।   অদ্য ধামরাই থানা পুলিশ- অর্থ আত্মসাত, চুরি ও প্রতারণার মামলায়  মুকুলকে মিরপুরের পীরেরবাগের বাড়ী থেকে গ্রেফতার করে।  

পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ার ঝামেলায়? গুগল দিচ্ছে সহজ সমাধান

আজকাল অনলাইন জীবনে অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও ইমেইলের জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড রাখা একেবারেই ঝামেলার কাজ। সব পাসওয়ার্ড মনে রাখা কঠিন, আবার ভুলে গেলে “Forgot Password” ঝামেলাও কম নয়! এই সমস্যার সহজ সমাধান নিয়ে এসেছে গুগল — Google Password Manager। একবার সেটআপ করলেই আপনার পাসওয়ার্ড সবসময় থাকবে আপনার সঙ্গে—নিরাপদে সেভ থাকবে এবং প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (Auto-fill) বসে যাবে লগইনের সময়।   🔒 Google Password Manager কীভাবে কাজ করে? এই ফিচারটি আপনার গুগল অ্যাকাউন্টে পাসওয়ার্ড সেভ করে রাখে। এরপর আপনি কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে লগইন করতে গেলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসওয়ার্ড পূরণ করে দেয়। ফলে বারবার টাইপ করার ঝামেলা বা ভুলে যাওয়ার ভয় আর থাকে না।   📱 অ্যান্ড্রয়েড ফোনে চালু করার সহজ উপায় 1. ফোনের Settings খুলুন 2. নিচে স্ক্রল করে Google অপশনে ট্যাপ করুন 3. Manage your Google Account-এ যান 4. উপরের দিকের Security ট্যাব নির্বাচন করুন 5. নিচে গিয়ে Password Manager-এ ট্যাপ করুন 6. Offer to save passwords অপশনটি On করে দিন এখন থেকে আপনি যখন কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে লগইন করবেন, গুগল নিজেই জিজ্ঞাসা করবে — “পাসওয়ার্ড সেভ করতে চান?”   💻 কম্পিউটারে (Chrome ব্রাউজারে) চালু করার পদ্ধতি 1. Chrome ব্রাউজার খুলুন 2. উপরের ডান পাশে থাকা তিনটি ডট (⋮) এ ক্লিক করুন 3. Settings নির্বাচন করুন 4. বাম পাশে থাকা Autofill and Passwords মেনুতে ক্লিক করুন 5. Google Password Manager খুলুন 6. Offer to save passwords অপশনটি On করে দিন এখন থেকে গুগল আপনার সব পাসওয়ার্ড সেভ করে রাখবে এবং যেকোনো ডিভাইসে গুগল অ্যাকাউন্টে লগইন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অটো-ফিল হয়ে যাবে।   🧭 সংক্ষেপে ফোনে: Settings → Google → Manage Account → Security → Password Manager → On কম্পিউটারে (Chrome): Settings → Autofill & Passwords → Google Password Manager → Offer to save passwords → On --- 🔐 আর পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ার ভয় নয়! গুগল রাখবে আপনার সব পাসওয়ার্ড নিরাপদে, সহজে ও ঝামেলামুক্তভাবে। প্রযুক্তি হোক আরও স্মার্ট, জীবন আরও সহজ।

১৮ বছর ‘‌নিখোঁজ’ থাকার পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে দেখেন বাবা-মা নেই, স্ত্রী অন্যের সংসারে

মালয়েশিয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়ে বছরের পর বছর জেলের দুর্বিষহ জীবনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীর। হারিয়েছেন বাকশক্তিও। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো অঝোরে কেঁদে ফেলেন। ভাগ্য বদলের আশায় দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন নরসিংদীর চরদিঘলদী ইউনিয়নের জিতরামপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম। সেখানে গিয়ে প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও একসময় তা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন, হয়তো মারাই গেছেন জাহাঙ্গীর। এভাবে কেটে গেছে দীর্ঘ দেড় যুগ। অবশেষে গত ৭ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন তিনি। তবে এতোদিনে বাবা-মা আর নেই, স্ত্রীও এখন অন্যের সংসারে।   জানা গেছে, ৬৬ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর আলম চরদিঘলদী ইউনিয়নের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। পেশায় জেলে ছিলেন। বিশাল মেঘনার বুকে মাছ ধরে জীবিকা চলত তার। সংসারে ছিলেন বাবা-মা, স্ত্রী ও চার সন্তান। দালালের খপ্পরে পড়ে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে অবৈধ পথে পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। প্রবাস জীবনের প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল জাহাঙ্গীরের। কিন্তু পরে সব বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন খোঁজ না পেয়ে পরিবার ধরে নেয়, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার জানান, গত ২১ অক্টোবর মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে নরসিংদী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে কল করেন কাউন্সেলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম। তিনি জানান, এক বাংলাদেশী সেখানে ক্যাম্পে আটক রয়েছেন। তার কাছে পাসপোর্ট কিংবা আইডি কার্ড, কোনো ডকুমেন্টই নেই। অসুস্থতার কারণে কথা বলতে পারেন না। এতে তার নাম-পরিচয় কিছুই জানা যাচ্ছিল না। হাইকমিশন সম্প্রতি ওই ব্যক্তির ছবি দিয়ে পরিচয় জানতে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে নিজেদের স্বজন দাবি করে যোগাযোগ করলেও কেউই যথাযথ প্রমাণ দেখাতে পারেননি। একই সময় নরসিংদী সদরের এক ব্যক্তি পোস্টের নিচে মন্তব্য করে জানান, লোকটি চরদিঘলদী ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে পারেন। হাইকমিশন বিষয়টি যাচাই করার অনুরোধ জানালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যবস্থা নেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনদের সহায়তায় খুঁজে পাওয়া যায় একটি পরিবারকে। কথা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই ব্যক্তিই ১৮ বছর আগে মালয়েশিয়া গিয়ে নিখোঁজ হওয়া জাহাঙ্গীর আলম। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত ভালো নয়- বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় সব নথি সংগ্রহ করে দ্রুততম সময়ে হাইকমিশনে পাঠান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলমকে সরকারি ব্যয়ে দেশে পাঠানোর অনুরোধও জানান তিনি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর গত ৭ নভেম্বর দেশে ফেরেন জাহাঙ্গীর আলম। পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দর থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু এরপরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। দেশে এসে দেখেন, বাবা-মাকে হারিয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন পরিবারে ঠাঁই নিয়েছেন তার স্ত্রীও। মালয়েশিয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়ে বছরের পর বছর জেলের দুর্বিষহ জীবনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীর। হারিয়েছেন বাকশক্তিও। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো অঝোরে কেঁদে ফেলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে ২০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় উপহারসামগ্রী দেয়া হয়। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে তিনি নরসিংদী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জাহাঙ্গীরের বড় ছেলে আমান উল্লাহ বলেন, আমরা বাবাকে পেয়ে আবেগে আপ্লূত। উনি আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন, এটাই বড় পাওয়া। আমাদের পরিবারের সবাই খুশি। চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোসা. সেলিনা আক্তার বলেন, আমাদের পরিষদ থেকে কিছু অর্থ দেয়া হয়েছে। তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে জাহাঙ্গীর আলমের মতো যেন কেউ দেশের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে আমরাও সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করব।   নরসিংদী সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, জেনে বা না জেনে কেউই যেন জাহাঙ্গীর আলম বা তার পরিবারের মতো ভুল না করেন। দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। একটি ভুল যেন পরিবারের সারাজীবনের কান্না হয়ে না দাঁড়ায়।

কোর্টে হাজিরা দিতে গিয়েই গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন

রাজধানীর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন (৫৬) নিহত হয়েছেন। আজ আদালতে তিনি একটি মামলার হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী রিপা আক্তার।   সোমবার (১০ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে এলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মামুন লক্ষ্মীপুর সদরের মোবারক কলোনির এস এম ইকবাল হোসেনের ছেলে।   নিহত মামুনের স্ত্রী রিপা আক্তার জানান, আমার স্বামী বিএনপি সমর্থিত একজন কর্মী ও পাশাপাশি ব্যবসা করতো। আজ তার কোর্টে হাজিরা ছিল। আমরা জানতে পারি আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। পরে ঢাকা মেডিকেলে হাসপাতালে এসে আমার স্বামীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই।    এদিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেলের ওয়ার্ড মাস্টার মহিবুল্লাহ জানান, আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে তাদের হাসপাতালের সামনের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। শব্দ শুনে হাসপাতালের মেইন গেটের সামনের এসে ওই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধার করে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি দেখে সেখান থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। তবে দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।   এ দিকে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির খালাতো ভাই হাফিজ জানান, আমার ভাই তারিক সাঈদ মামুন একজন সাধারণ মানুষ। কী কারণে তাকে কে হত্যা করা হলো, আমি জামি না। সে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কারা তাকে হত্যা করেছে, কী কারণে করেছে আমার জানা নেই।   সিসিটিভি ফুটেছে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনে দুইজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এসে গুলি করে। পরে তারা নির্দ্বিধায় পালিয়ে যায়।   শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি বলেন, তারিক সাঈফ মামুন নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী কি না বলতে বলতে পারছি না। তবে তিনি ক্যাপ্টেন ইমন গ্রুপের লোক ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।   ডিসি তালেব বলেন, তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। আজ সে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার পরেই দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।   জানা যায়, নিহত সাঈফ মামুন শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমনের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তবে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমনের দ্বন্দ্ব চলছিল। দীর্ঘ ২৪ বছর জেল খাটার পর ২০২৩ সালে তিনি জেল থেকে বের হন।   এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেজগাঁও সাত রাস্তায় মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ওই ঘটনায় মামুন আহত হলেও পথচারী ভুবন চন্দ্র শীল নিহত হয়। নিহত মামুন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই শহীদ সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি ছিলেন।

সপ্তাহের সেরা

ছবি : সংগৃহীত
জাতীয়

ঈদুল ফিতরে টানা ১০ দিনের ছুটির সুযোগ

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬ 0